সুদূর এক শান্ত গ্রামে, যেখানে বাতাস সবসময় বুনো ফুলের সুগন্ধে ভরা থাকত, সেখানে বাস করত দুই বন্ধু—বিমল এবং অমল। তাদের দুজনেরই ছিল অগাধ জ্ঞান এবং অদ্ভুত এক শখ: জীবনের বড় বড় দর্শন নিয়ে তর্ক করা।
গ্রামের বড় চণ্ডীমণ্ডপে বসে প্রায় প্রতিদিনই তারা গভীর আলোচনায় ডুবে যেত। একদিন তাদের আলোচনার বিষয় ছিল: “একজন আদর্শ ভালো মানুষ কেমন হয়?”
বিমল ছিল অত্যন্ত যুক্তিপ্রবণ। সে বলতে শুরু করল, “অমল, একজন ভালো মানুষকে অবশ্যই সবসময় সৎ হতে হবে। সত্য কথা বলা তার ধর্ম হবে। কোনোভাবেই সে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেবে না, এমনকি নিজের বা পরিবারের ক্ষতি হলেও।”
অমল মাথা নাড়িয়ে দ্বিমত প্রকাশ করল। “কিন্তু বিমল, যদি একটি মিথ্যা কথা কোনো নির্দোষ প্রাণ বাঁচাতে পারে, তবে কি সে তা বলবে না? আমার মতে, একজন ভালো মানুষের মন হবে অত্যন্ত দয়ালু। অন্যের উপকার করার জন্য যদি নিয়ম একটু ভাঙতেও হয়, সে তা ভাঙবে। সততার চেয়ে দয়া বড়।”
তর্ক শুরু হলো। বিমল জোর দিয়ে বলতে থাকল যে, নিয়ম আর সততাই সবকিছুর ভিত্তি। অমল উল্টোদিকে জোর দিল যে, করুণা আর দয়াই মানব জীবনের সর্বোচ্চ গুণ। কথা কাটাকাটি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তাদের তর্ক এতটাই প্রবল হয়ে দাঁড়াল যে, আশেপাশের গ্রামের লোকও এসে ভিড় করতে শুরু করল। কেউ বিমলের পক্ষে, কেউ অমলের পক্ষে। গ্রামবাসীদের মধ্যেও বিভেদ তৈরি হয়ে গেল। যে গ্রাম আগে শান্তির নীড় ছিল, সেখানে এখন তর্ক, মতবিরোধ আর উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি হলো।
এমন সময় সেই চণ্ডীমণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে বর্ষীয়ান ব্যক্তি, দাদুজি। তিনি সবার মাঝে বিভেদ এবং অসন্তোষ দেখে এগিয়ে গেলেন।
দাদুজি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা সবাই কেন এত উত্তেজনায় ভুগছ? বিমল আর অমল, তোমরা কি নিয়ে তর্ক করছ?”
বিমল এবং অমল দুজনেই তাদের নিজেদের যুক্তি দাদুজির কাছে পেশ করল। তারা জানতে চাইল, দাদুজি কার যুক্তি ঠিক? একজন ভালো মানুষ আসলে কে?
দাদুজি একমুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখে ফুটে উঠল এক করুণাময় হাসি। তিনি গ্রামের দিকে একবার তাকিয়ে বিমল এবং অমলের দিকে ফিরে বললেন, “আমি জানিনা ভালো মানুষের সংজ্ঞায় দয়া না সততা, কোনটি আগে আসা উচিত। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি, এই তর্ক তোমাদের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে, গ্রামের শান্তি নষ্ট করেছে।”
তিনি অমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অমল, তুমি মনে করো দয়াই সব। তাহলে আজ থেকে অন্তত একজন বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াও। কোনো মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করো না। দেখো, তুমি নিজেই ভালো মানুষ হয়ে উঠছ কি না।”
তারপর দাদুজি বিমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিমল, তুমি মনে করো সততাই সব। তাহলে আজ থেকে নিজের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি কথায় অন্তত সততা পালন করার চেষ্টা করো। দেখবে, তুমি নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছ কি না।”
দাদুজির কথাগুলো সবার মনে গিয়ে বিঁধল। সবাই বুঝতে পারল যে, ভালো মানুষের সংজ্ঞা নিয়ে তর্ক করা সম্পূর্ণ অর্থহীন। এই তর্ক কেবল অহংকার বাড়ায় এবং বিভেদ সৃষ্টি করে। আসল শান্তি এবং কল্যাণ লুকিয়ে আছে সেই গুণগুলো নিজের জীবনে বাস্তবে প্রয়োগ করার প্রচেষ্টায়।
অমল এবং বিমল লজ্জিত হলো। তারা একে অপরের কাছে ক্ষমা চাইল এবং সেই দিন থেকে তারা আর কখনো এই বিষয় নিয়ে তর্ক করল না। বরং, অমল অভাবী মানুষের সাহায্য করতে শুরু করল এবং বিমল তার প্রতিটি কাজে সততা বজায় রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। তাদের এই পরিবর্তন দেখে গ্রামবাসীরাও অনুপ্রাণিত হলো। ধীরে ধীরে সেই গ্রামে আবার শান্তি ফিরে এলো।
গল্পের নৈতিক শিক্ষা: একজন ভালো মানুষ কেমন হয় তা নিয়ে তর্ক করা ক্ষতিকর। বরং একজন ভালো মানুষ হবার চেষ্টা শান্তি আন্তে পারে।
