2#
এ এই কে বললাম ডুমুর খালি গ্রাম থেকে যশোর শহর ১৯২০ সালের কোনো কবি গানের আসরের গল্প লিখ, আমি সম্পাদনা করে নিবো- সে লিখলো:
বর্ষার জল নামতে শুরু করলেই যশোরের সেই গ্রামটা যেন নতুন করে শ্বাস নিত। কাঁচা রাস্তার ধুলো ধুয়ে যেত, পুকুরের জল চকচক করত, আর সন্ধ্যা নামলেই বটগাছের নিচে বসত বৈঠকিগানের আসর।
গ্রামের মানুষ এটাকে শুধু গান বলত না—বলত “বসে থাকা আনন্দ”।
কেউ খোল নিয়ে বসে, কেউ হারমোনিয়াম, কেউ শুধু তালি। আর মাঝখানে বসতেন কাদের গায়েন—ধুয়া ধরার জন্য যার জুড়ি ছিল না।
তিনি যখন ধুয়া তুলতেন, মনে হতো গানটা যেন কারও কণ্ঠে নয়—মাটির ভেতর থেকে উঠছে।
শহুরে প্রলোভন
এই শান্ত তাল কেটে একদিন গ্রামে এল রফিক নামের এক লোক।
সে প্রথম দিন আসরে বসে খুব মন দিয়ে গান শুনল।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
“আপনাদের গান অসাধারণ। কিন্তু শুধু গ্রামে বসে গাইলে হবে? যশোর শহরে নিয়ে যান্টা শো করি। বড় মঞ্চ, আলো, মাইক—টিকিট কেটে মানুষ শুনবে। আপনারা বিখ্যাত হয়ে যাবেন!”
কথাগুলো শুনে তরুণদের চোখে আলো জ্বলে উঠল।
খ্যাতি—এই শব্দটার আলাদা জাদু আছে।
কাদের গায়েন চুপচাপ শুনলেন। শুধু জিজ্ঞেস করলেন—
“গান যেমন আছে তেমনই থাকবে তো?”
রফিক একটু হেসে বলল—
“দেখুন, একটু আধুনিক করতে হবে। ধুয়া ছোট করতে হবে, কথা একটু বদলাতে হবে। দর্শক বিনোদন চায়, এত ধীর লয় এখন চলে না।”
আলো ঝলমলে মঞ্চ
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শহরে শো হলো।
মঞ্চে রঙিন আলো, পেছনে ডিজিটাল ব্যাকড্রপ, সামনে শত শত দর্শক।
গান শুরু হলো—
কিন্তু কাদের গায়েনের মনে অদ্ভুত শূন্যতা।
ধুয়া ছোট, তালে তাড়াহুড়ো, কথায় মাটির গন্ধ নেই।
দর্শক হাততালি দিচ্ছে, কিন্তু গান যেন কোথাও গিয়ে ভেঙে পড়ছে।
শো শেষে রফিক খুশি। টিকিট বিক্রি হয়েছে, লাভ হয়েছে।
দলের হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে বলল—
“দেখলেন? এটাই ভবিষ্যৎ।”
কেউ কিছু বলল না।
ফেরার পথে গরুর গাড়ির ভেতর অদ্ভুত নীরবতা।
ফিরে পাওয়া
পরের পূর্ণিমায় আবার গ্রামে আসর বসল।
বটগাছের নিচে আগের মতোই চৌকি পাতা, কুপির আলো, মাটির গন্ধ।
কিন্তু মানুষ আজ একটু চুপচাপ।
মনে হচ্ছে, সবাই অপেক্ষা করছে—কিসের জন্য, যেন নিজেরাও জানে না।
কাদের গায়েন ধীরে ধীরে হারমোনিয়ামের ঢাক খুললেন।
একটু সুর মিলিয়ে, চোখ বন্ধ করে, পুরনো সেই ধুয়া তুললেন—
“যদি প্রভাত না হইতো তবে কি হইতো
এ জীবন বহিত কিসে…”
প্রথমে নিস্তব্ধতা।
তারপর এক কোণ থেকে এক গলা।
তারপর আরেকজন।
তারপর সবাই।
ধুয়া আবার ভরে গেল বাতাসে—ধীর, গভীর, অনাড়ম্বর।
মনে হলো বটগাছের পাতাও যেন সুরে দুলছে।
উপলব্ধি
গান শেষে কাদের গায়েন মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন—
“গানকে বাজারে নেওয়া দোষের না।
কিন্তু গান যদি নিজের ধুয়া মাটি ভুলে যায়, তখন সে শুধু শব্দ থাকে—সুর থাকে না।
যে ধুয়া মানুষের বুক থেকে ওঠে, তাকে ছোট করলে গানও ছোট হয়ে যায়।”
দূরে দাঁড়িয়ে রফিক সব শুনছিল।
সেই প্রথম তার মনে হলো—
লাভ আর মূল্য এক জিনিস নয়।
শেষ কথা
তারপর থেকে দল শহরে গেয়েছে, মঞ্চেও উঠেছে—
কিন্তু নিজের নিয়মে।
ধুয়া বদলায়নি, কথা বদলায়নি, মাটির গন্ধও না।
গ্রামের মানুষ আজও বলে—
গান যদি মানুষের জন্য হয়, সে বেঁচে থাকে।
গান যদি শুধু লাভের জন্য হয়, সে বাজে—কিন্তু বাজে না হৃদয়ে।
যদি প্রভাত না হইতো তবে কি হইতো
এ জীবন বহিত কিসে
কণ্ঠ : কানিজ ফাতেমা লুনা, কথা ও সুর : সংগ্রহ কম্পোজিশন : মোহাম্মদ নাসিরুল্লাহ, ভিডিও: লিডিয়া রহমান
