বাংলা মতুয়া দার্শনিক তত্ত্ব

বাংলা মতুয়া দার্শনিক তত্ত্ব। মানবতাবাদী মতুয়া দর্শন। বর্তমান বাংলাদেশে এই দর্শনের উৎপত্তি। মতুয়া দর্শন প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুর নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ে জন্ম নেন ১৮১১ সালে যশোমন্ত ঠাকুরের ঘরে খুলনার গোপালগঞ্জ গ্রামে। এ নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন আছে তিনি  বৈকুন্ঠের নারায়ণের অবতার এ বিষয়টি নিয়ে। ভক্তিতে ভগবান মেলে, অভক্তিতে অপমান। হরিচাঁদ ঠাকুর যখন কিশোর বয়সে পৌঁছান, তখন তার আত্মদর্শন ঘটে। পূর্বজন্মে সে ছিল অবতার রাম। হরিচাঁদ কিশোর অবস্থায় তার মৃত ভাইকে জীবিত করেন। এ ব্যাপারে ইউটিউবে লোক শিল্পীদের কবিগান হরি কীর্তন অনুসন্ধান করলেই পাওয়া যাবে এ তথ্যের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিক আরো অনেক লৌকিক গল্প। হরিচাঁদ ভক্ত কে বলেন মাতা পিতার প্রতি কর্তব্য পালন ই মহার্ঘ্য; এর চেয়ে উন্নত মহার্ঘ্য আর নাই। অন্যান্য মহৎ কাজ এর মধ্যে ঐশ্বরিক গুন্ অর্জন করা। ক্ষুধার্থ কে খেতে দেয়া ঐশ্বরিক গুন্। সব তীর্থর বড়ো তীর্থ এই সংসার ক্ষেত্র। হরিচাঁদ এর স্ত্রী শান্তি ভক্ত কে ডেকে বলেন, শোনো বাছা মন্ত্র তন্ত্রর দরকার নেই, শুধু হরিনাম করলেই হবে। আর একটা কথা রেখো মনে –

কর্মক্ষেত্র সংসারেতে কর্ম মহা বল 

সকলেই পায় কর্ম অনুযায়ী ফল। 

মহেশ ন্যারত্ন মনু সংহিতা রচনা করে  যাতে লেখা আছে শুদ্রের শিক্ষার অধিকার কভু নাই বসুধায়। শুদ্র কোনোদিন সুন্দরী ব্রাহ্মণ নারী কে বিবাহ করতে পারবে না, যদি বিয়ে করে তাহলে একরাত কোনো ব্রাহ্মণের ঘরে রাখতে হবে, ব্রাহ্মণ প্রসাদ করবে তবে। হরিচাঁদ ঠাকুর বলেন, চারটি বর্ণ গুন্ ও কর্ম অনুযায়ী। বর্ণ নির্ধারিত হবে গুন্ ও কর্ম অনুযায়ী বলেছন অবতার কৃষ্ণ। বেদব্যাস বলেন, অজ্ঞান যে সেই শুভ্র। বশিষ্ট একজন বেশ্যার ছেলে। তিনি নিজস্ব গুনে ব্রহ্ম ঋষি। জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো, কর্মের দ্বারায় জ্বলে উঠে জীবের অভ্যন্তরীণ আলো। ত্রিবিদ্যা সাধন করে বিশ্বামিত্র হয়েছিল ব্রাহ্মণ। সে ছিল ক্ষত্রিয় পুত্র! সে ছিল অবতার রামের শিক্ষাগুরু। অর্জুন ক্ষত্রিয় পুত্র। ব্রাহ্মণ হতে হলে ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম না নিয়েও ব্রাহ্মণ হয়েছে অনেকে। মুসলমান ও ব্রাহ্মণ হতে পারে। যে পিতৃধন রক্ষা করতে পারেনা, সে ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নিলেও ব্রাহ্মণ হবে না।  

ত্রিবিদ্যা সাধন করে বিশ্বামিত্র হয়েছিল ব্রাহ্মণ। বর্ণ অনুযায়ী সে ছিল ক্ষত্রিয়। কর্ম গুনে সে হয়েছিল ব্রাহ্মণ। বিশ্বামিত্র গায়ত্রী মন্ত্র এর প্রণেতা- চার বেদের মূল মন্ত্র। বিশ্বামিত্র গাছে মানুষ ধরাবে বলে একবার ধ্যানে বসলো। দেবতারা ভাবলো দেবতা ভাবলো সর্বনাশ, বিশ্বামিত্র তো আমাদের দেবত্ত্ব নিলো হরে- ব্রহ্মের ব্রহ্মত্ব, বিষ্ণুর বৈশ, শিবের শিবত্ব হরণ করা ঠেকাতে মেনকা সুন্দরী কে পাঠালো থামাতে। প্রখ্যাত লোককবি অসীম সরকার এ নিয়ে ইউ টিউব এ কবিগান পরিবেশনকালে উল্লেখ করেন। পিতৃধন রক্ষা করার উপায় যে শিখায় সেই গুরু। মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার বলেছেন ফকির লালন সাই। অশ্বিনী গোসাই: বাংলার বহুশ্রুত লোক কবি অশ্বিনী গোসাই এর হরি সংগীত থেকে জানা যায়- মতুয়া মতবাদে সবার উপর মানুষ সত্য; মাতা পিতা গাছের গোড়া। সকলেই পায় কর্ম অনুযায়ী ফল। 

একবার অশ্বিনী গোসাই শান্তিনিকেতনে সম্মেলনে যোগ দেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিমন্ত্রনে। সভায় তাকে দেখতে না পেয়ে রবি ঠাকুর জানতে পারেন তিনি মাটিতে বসে আছেন। সাদা পিরান, কোমরে লাল গামছা আর পরনে ধুতি। লম্বা কেশাগ্র যমুনা নদীর ঢেউ এর মতো, লম্বা দাঁড়ির দরবেশ এর বেশ ধরে। রবীন্দ্রনাথ তাকে বললেন, গুরু তুমি মাটিতে কেন? তিনি উত্তর করলেন, আমি মাটির মানুষ। মাটিতে গড়ানো আমার সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ তার সম্মান দাক্ষিণ্যে হরি কীর্তন শুনতে চাইলেন অশ্বিনী গোসাই এর কাছ থেকে। অশ্বিনী গোসাই বঙ্গাসনে উপবেশন করে গুরু পদে প্রণাম জানিয়ে ধুলা নিলেন। মাটি স্পর্শ না করলে তার প্রার্থনা হয়না। এই মাটি থেকেই উৎপত্তি আবার এই মাটিতেই প্রত্যাবর্তন। মানবতাবাদী মতুয়া দর্শন এর মূল এটাই। সর্ব অঙ্গে ধুলা মেখে হরিনাম স্তুতি- প্রার্থনা।রবি ঠাকুরের এর সাথে অশ্বিনী গোসাই এর সাক্ষাতের ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন অশ্বিনী গোসাই কর্তৃক লিখিত গানের পাণ্ডুলিপি রবীন্দ্রনাথের হাতে আসে। রবীন্দ্রনাথ কয়েকদিন সময় চেয়ে নেন পড়ে দেখবার জন্যে। তারপর পড়া শেষ হলে রবীন্দ্রনাথ বললেন, আমাকে কবিগুরু বলা হয়, অথচ আমি এই গ্রন্থে কোনো একটাও ভুল পাইনি। কে এই কবি? উনাকে কি আমাদের বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলনে নিমন্ত্রণ করা যায়? 

বাংলার লোক কবি অশ্বিনী গোসাই এর হরি সংগীত থেকে জানা যায়। মতুয়া মতবাদে সবার উপর মানুষ সত্য; মাতা পিতা গাছের গোড়া। ফল প্রত্যেকের কর্ম। সন্তান রূপকার্থে গাছ, যার কর্ম তার ই ফল। যেমন ফল তেমন বীজ- বলেন হরিচাঁদ ঠাকুর। হরিচাঁদ ঠাকুর সংসার ফেলে ব্রহ্মচারী হতে বলেনি। নিজ স্ত্রী নিয়ে ব্রহ্মে আনন্দে বিচরণ করবে। পিতৃধন রক্ষা না করলে নিরানন্দে বিচরণ করবে। পিতৃধন রক্ষা করার ফল আনন্দ, সকলেই পায় কর্ম অনুযায়ী ফল। কিভাবে সংসারে থেকেও ইস্টের দর্শন লাভ করা যায় সেই সংসার ধর্ম দর্শন প্রচার করেন চৈতন্য মহাপ্রভু। পিতৃধন রক্ষা করার উপায় যে শিখায় সেই গুরু।  কবি অশ্বিনী গোসাই বলেন, সেই সে বাপের বিটা বিচক্ষণ, রক্ষা করে যে পিতৃধন। যারা সংসারে থাকবে তারা কিভাবে সংসার ধর্ম করবে? পৃথিবীতে সন্ন্যাসীর চেয়েও সংসারী বেশি। মহাপুরুষ গণ সংসারে ই জন্ম নেন। আশ্রমে বা মসজিদে জন্ম নেন না। মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার বলেছেন ফকির লালন সাই। যে পিতৃধন রক্ষা করতে পারেনা, সে ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নিলেও ব্রাহ্মণ হবে না। পতিতের উদ্ধার করতে হয় দুই ভাবে-  জাগতিক ও আধ্যাত্বিক শিক্ষায়। সংসারে বসে কিভাবে পাবে ইস্টের দর্শন? অশ্বিনী গোসাই এর হরি সংগীত থেকে জানা যায়-

…লয়ে নিজ নারী ব্রম্মচারী সৎচরিত্র রবে 

হাতে কাম মুখে নাম সত্য কথা কবে 

পর সতী পর পতি কভু না স্পর্শিবে 

তুমি না ডাকিলেও হরি তোমারে ডাকিবে 

সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় হবে কেউ যেই 

না থাকুক তার ক্রিয়া কর্ম হরিতুল্য সেই… 

লোককবি অসীম সরকার বলেন, তারক গোসাই, হরি লীলা চরিত রচয়িতা, যখন হরিচাঁদ ঠাকুরের সাথে দেখা করতে আসে তখন তারক হরিচাঁদ ঠাকুরের জায়গায় একবার কৃষ্ণ মূর্তি দেখে আবার রামের মূর্তি দেখে। হরিচাঁদ এর সাক্ষাৎ দর্শনে  ভক্ত হীরামন গোসাই এর মনে পড়ে যে সে পূর্বজন্মে ছিল রামের হনুমান। অবতার কৃষ্ণ এবং অবতার রাম যখন আসেন তখন তারাও পাঠশালায় দীক্ষা নিতে যান। অবতার দের মধ্যে নিজ জাতির লোকের জন্যে পাঠশালা গড়ার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন, বাংলা জাতির প্রথম অবতার হরিচাঁদ ঠাকুর। প্রাচীন যুগে মানুষ গুরু গৃহে গিয়ে শিক্ষা নিতে হতো। ব্রাহ্মণ পুত্র ছাড়া কেউ লেখা পড়া করার সুযোগ ছিলোনা। কৃষ্ণ গিয়েছিলেন সন্দীপনী মুনির বাড়ি। গৌরাঙ্গ। মহাপ্রভু গেলো বিদ্যানিধির তোলে পঞ্চদশ শতাব্দীতে মধ্যে যুগে। কোন ভগবান মানুষের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করছে? লোককবি অসীম সরকার এই বিষয়টিকে উল্লেখ করেন তার কবিগানে। পতিতের উদ্ধার করতে হয় দুই ভাবে-  জাগতিক ও আধ্যাত্বিক শিক্ষায়। হরিচাঁদ ঠাকুর এইজন্যে অবতার যে উনি একটি সম্প্রদায় কে জাগতিক ও আধ্যাত্বিক শিক্ষায় মুক্ত করেন এবং তার দর্শন বিশ্বজনীন।